সরকারি বিনামূল্যের বই বিতরণ উৎসব ভেস্তে গেল কামাল খামার মাদরাসায়

0
1110

অবৈধ সভাপতি ও অবৈধ প্রিন্সিপাল চালায় মাদরাসা

সকালের কাগজ রিপোর্ট: বইয়ের জন্য শিক্ষার্থীদের নিকট থেকে টাকা নেয়ার কারণে সরকার ঘোষিত বিনামূল্যের বই বিতরণ উৎসব মুখর হয়নি উলিপুরের কামাল খামার ফাযিল (ডিগ্রী) মাদরাসায়। টাকা দেয়ার ভয়ে অনেক শিক্ষার্থী মাদরাসায় আসেনি। আর অনেকে টাকা দিতে না পারায় বই না পেয়ে ফেরত গেছে। আরো নানা অনিয়মে মাদরাসাটি দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম। দেখার যেন কেউ নেই।
সরেজমিন দেখা যায়, সোমবার দুপুর ১.৩৫টায় কিছু ছাত্র-ছাত্রী টাকা দিয়ে বই নিয়ে গেছে। আর টাকা জমা দেয়ার রসিদ হাতে নিয়ে ৭জন শিক্ষার্থী লাইব্রেরিয়ান আব্দুর রহমানের নিকট থেকে বই নেয়ার জন্য লাইব্রেরিতে ভিড় করছিল । লাইব্রেরিয়ানের কাছে বিভিন্ন ক্লাসের জমাকৃত ১১০টি রসিদ পাওয়া যায়। এতে দেখা যায় ১ম শ্রেণি ২০টাকা, ২য় শ্রেণি ৩০টাকা, ৩য় শ্রেণি ৪০টাকা, ৪র্থ শ্রেণি ৫০টাকা, ৫ম শ্রেণি ৬০টাকা, ৬ষ্ঠ শ্রেণি ১১০টাকা, ৭ম শ্রেণি ১২০টাকা, ৮ম শ্রেণি ১৩০টাকা ও ৯ম শ্রেণি ১৫০টাকা হারে রসিদ দিয়ে আদায় করার পর বই দেয়া হয়েছে।
মাদরাসা সূত্রে জানা যায়, ১৯৫২ সালে প্রতিষ্ঠিত মাদরাসাটিতে বর্তমান প্রথম শ্রেণি থেকে ফাযিল (ডিগ্রী) পর্যন্ত চালু রয়েছে। মাদরাসায় আপডেট কোন তথ্য নেই। আনুমানিক সেখানে প্রায় ১০০০ শিক্ষার্থী রয়েছে। শিক্ষক স্বল্পতা রয়েছে। উপাধ্যক্ষ পদটিও খালি।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, মূলতঃ মাদরাসাটিতে বর্তমানে কোন গভর্নিং বডি নেই। অধ্যক্ষ সাময়িক বরখাস্ত থাকার কারণে নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসের বেতন ছাড় হচ্ছেনা। অন্যদিকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ থাকলেও বরখাস্তকৃত অধ্যক্ষ দায়িত্ব পালন করছেন। সূত্র মতে বিভিন্ন খুঁটির জোরে একেক ব্যক্তি একেকবার কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় বা ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় হতে গভর্নিং বডির সভাপতি হিসেবে মনোনয়ন নিয়েছেন। এর মধ্যে মহামান্য হাইকোর্ট থেকে একজনের দায়িত্ব পালনের স্থগিতাদেশ জারি করা হয়। মনোনয়নগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১১.০৮.২০১৪ তারিখে কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় এর রেজিস্ট্রার কর্তৃক মোঃ মতিয়ার রহমান মনোনয়ন পান কামাল খামার মাদরাসার সভাপতি হিসেবে, একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৩.১২.২০১৪ তারিখে মনোয়ন পান ওমর ফারুক সভাপতি হিসেবে এবং ১২.০৩.২০১৫ তারিখে সভাপতি হিসেবে মনোনয়ন পান সার্জেন্ট (অবঃ) আলহাজ্ব আব্দুল খালেক। কিন্তু ১৩.০৪.২০১৫ তারিখে মহামান্য হাইকোর্ট থেকে আব্দুল খালেক এর মনোনয়নের ওপর স্থগিতাদেশ দেয়া হলে তার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব পরিবর্তন হলে ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় এর রেজিস্ট্রার কর্তৃক সভাপতি হিসেবে মনোনয়ন পান ওমর ফারুক এবং তিনি ০৭.১১.২০১৭ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এ কমিটির মেয়াদ চলাকালিন সময়ের ৪ মাস পূর্বে পরবর্তী গভর্নিং বডি গঠনের কার্যক্রম গ্রহণ করে ওই কমিটির অনুমোদন নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে। কিন্তু সে মেয়াদে কোন নতুন কমিটি গঠিত হয়নি।
অন্যদিকে বিভিন্ন অনিয়মের কারণে সভাপতি ওমর ফারুক ০২.১০.২০১৭ তারিখে অধ্যক্ষ মোঃ লিয়াকত আলীকে সাময়িক বরখাস্ত করেন। ওমর ফারুকের মেয়াদ ০৭.১১.২০১৭ তারিখে শেষ হলে সার্জেন্ট (অবঃ) আলহাজ্ব মোঃ আব্দুল খালেক স্বঘোষিত সভাপতি হিসেবে কাজ শুরু করেন যা ছিল অবৈধ। তিনি নিজে অবৈধ সভাপতি হয়ে সাময়িক বরখাস্তকৃত অধ্যক্ষ মোঃ লিয়াকত আলীকে পুনর্বহাল করেন যা অবৈধ। সে হিসেবে অবৈধ সভাপতি ও অবৈধ অধ্যক্ষ দিয়ে চলছে মাদরাসার কাজ। এই অধ্যক্ষ তার আপন ভায়রা ভাই মোঃ আবু নোমানকে ২৩ লাখ টাকার বিনিময়ে আরবি প্রভাষক হিসেবে এবং বিজ্ঞান বিভাগের ৪জন শিক্ষক খাদিজা পারভিন, এসএম নুর আলম, বাবুল আহমেদ ও রবীন্দ্রকে নিয়োগ দিয়ে কমপক্ষে ৫০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেন যার সঠিক হিসেব দিতে পারেননি। এনিয়ে অধ্যক্ষকে সচেতন এলাকাবাসী লাঞ্ছিত করে ১২-১৩ লাখ টাকা উদ্ধার করে মাদরাসার কাজে ব্যয় করেন।
অভিযোগ রয়েছে, মাদরাসা সংলগ্ন বাড়ী বিপিএড শিক্ষক মোঃ মাসুদ আলী এতটাই প্রভাবশালী যে সাধারণ শিক্ষক থেকে অধ্যক্ষ পর্যন্ত তার কথামতো চলতে বাধ্য হন। মাদরাসা অনেকটা তার ইশারায় চলে। শিক্ষকরা নিয়মিত ক্লাস করেননা। অনেক শিক্ষার্থী ঝড়ে পরছে ক্রমান্বয়ে। গভর্নিং বডি বা শিক্ষক কারুরই নেই কোন দায়বব্ধতা। ক্রমান্বয়ে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হচ্ছে মাদরাসাটি।
কিন্তু এতকিছু চললেও দেখার যেন নেই কেউ। যে যার যার মতো ক্ষমতা ফলিয়ে চলার কারণে মূলতঃ মাদরাসার শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। ফলে এলাকার প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবনে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এলাকাবাসী এর সুরাহা চেয়ে বিভিন্ন মহলে আবেদন নিবেদন করলেও প্রভাবশালীদের কাছে নিরুপায় হয়ে সন্তানদের লেখাপড়া করাচ্ছেন ওই মাদরাসায়।
মাদরাসার অধ্যক্ষ হিসেবে দাবিকারী লিয়াকত আলী বই বিতরণে টাকা নেয়ার কথা স্বীকার করে জানান, ৩১ ডিসেম্বর পরীক্ষার ফলাফল দেয়ার পরপরই শিক্ষার্থীদের নিকট থেকে ভর্তির নিয়মানুযায়ী টাকা নেয়া হয় যা চলমান রয়েছে। বই নেয়ার সময় টাকা না নিলে পরে টাকা পাওয়া যায়না। আর অবৈধ সভাপতির ব্যাপারে তার সাফ কথা বর্তমান মাদরাসায় কোন গভর্নিং বডি নেই। তার অবৈধ পুনর্বহাল বিষয়ে তিনি বলেন, আমিই প্রকৃত অধ্যক্ষ। দুর্নীতির বিষয়ে বলেন মাদরাসায় কোন দুর্নীতি নেই।
এ বিষয়ে কুড়িগ্রামের অতিরিক্তি জেলা প্রশাসক (সার্বিক) রফিকুল ইসলাম সেলিম জানান, গভর্নিং বডি না থাকলে সরকারি পরিপত্র অনুযায়ী বিল ছাড় দেয়ার অনুমোদন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা) দিয়ে থাকে। এ ছাড়া তাদের সার্বিক দেখভাল করার সুযোগ কম। মাদরাসাটির শিক্ষক-কর্মচারীদের মাসিক বিল জমা দিয়েছে। বই বিতরণ উৎসব মুখর করার পরিবর্তে টাকা নিয়ে বই বিতরণ করা অনিয়ম। টাকা নেয়াসহ অন্যান্য বিষয় খতিয়ে দেখা হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here