দূর্নীতি দমনে ইসলাম

0
203

মাওলানা মোঃ সিরাজুল ইসলাম ফারুকী-

দূর্নীতি একটি সামাজিক অভিশাপ। কোন জাতীর ধ্বংসের পূর্বে তাদের মধ্যে দূর্নীতি মহামারীর মত বিস্তার লাভ করে থাকে। আল্লাহ তায়ালা বিভিন্ন যুগে পৃথিবীর বিভিন্ন জাতিকে শাস্তি দেওয়ার প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে বলেন “যারা দেশে সীমালঙ্ঘন করেছে এবং তাতে বড় বেশী ফাসাদ/দূর্নীতি করেছে, তাদের উপর তোমার প্রভু শাস্তির কষাঘাত হানলেন। নিশ্চয়ই তোমার প্রতিপালক শতর্ক দৃষ্টি রাখেন। সূরা আল-ফজর-১১-১৪।
আজ সমাজের সর্বস্তরে দূর্নীতির দাপট দেখতে পাই। কোন কাজে নিয়ম-নীতি বা আইনের বিধি-বিধান না মেনে নিজের স্বার্থে বেপরোয়া কাজ করে যাওয়াকে এককথায় দূর্নীতি বলে। আইন কে ফাকি দিয়ে কখনও কখনও আল্লাহর বান্দাগণ তার পেশীশক্তির প্রভাব খাটিয়ে নিজের মতলব হাসিল করে থাকে।
বর্তমানে আমরা দেখতে পাই অবৈধ সিন্ডিকেট, অসৎ ফায়দা হাসিলের জন্য খাদ্যে ভেজাল/ফরমালিন মিশিয়ে বিক্রি করা। চাকুরীতে নিয়োগ বানিজ্য, অফিস আদালতে কোন সুবিধা লাভের ক্ষেত্রে ঘুষের লেনদেন এখন অলিখিত নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরীক্ষায় নকল, শিক্ষাকে বানিজ্য বানানো অবৈধ দখলদারী, টেন্ডারবাজি চাঁদাবাজি, আর্থিক অনিয়ম ইত্যাদি সকল প্রকার দূর্নীতি ইসলামে হারাম।
দূর্নীতির উপসর্গসমূহ আত্মিক, মানুষের অন্তকরণে সৃষ্টি লোভ, হিংসা, প্রতিহিংসা, গর্ব অহংকার-অহমিকা প্রদর্শননেচ্ছা ইত্যাদি বদ স্বভাব সমূহই দূর্নীতিসহ যাবতীয় অসৎকর্ম করতে ইন্দন জোগায়।
মানবজাতি যাতে আল্লাহর মহাকল্যাণ লাভের জন্য তার সাধারণ বিধি-বিধান ও নিয়ম-নীতির জ্ঞান অনুযায়ী চলতে না পারে এবং সর্বদাই যাতে মানব জাতি নিজেরা নিজেরা মহা ধ্বংসে পতিত হয়ে শাস্তি ভোগ করে, সেই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য মানুষের দেহাভ্যান্তরে হৃদপিন্ড নামক স্থানে চিরশক্র অভিশপ্ত শয়তান ইবলিশ উপসর্গ সৃষ্টি করে। ফলে মানুষে মানুষে মারামারি খুনাখুনি, হানাহানি, ধর্ষন ছিনতাই, প্রতারনা, আমানত আত্মসাৎ এবং দূর্ণীতি সহ যাবতীয় মানব ধ্বংসকারী, সমাজ ধ্বংসকারী তথা দেশ ও বিশ্ব ধ্বংস ও বিপর্যয় সৃষ্টিকারী কর্মকান্ড সমূহ সংঘটিত হয় এবং মানুষের স্বাভাবিক জীবন যাত্রা ব্যাহত হয়।
আল্লাহ তাআলা আল-কুরআনে বহুবার অন্যের অধিকার নষ্ট করাকে হারাম ঘোষণা করেছেন। সহজ ও সঠিক পথ অনুসরণ করার হুকুম দিয়েছেন। আমরা প্রতি সালাতে সূরা ফাতিহা পাঠের সময় বলি “আমাদের সরল সঠিক পথে পরিচালনা করুন” কিন্তু আমরা কি সে পথে চলি? মোটেও না। ভেজাল, জালিয়াতি ও সকল সামাজিক দূর্নীতির বিরুদ্ধে মহান আল্লাহর এই হুকুম আমাদের মেনে চলতেই হবে। কারণ বহু আয়াতে অমান্যকারীদের জন্য শাস্তির বানী উচ্চারিত হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন “তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অন্যের অর্থ সম্পদ অন্যায় ভাবে গ্রাস করো না এবং মানুষের ধন-সম্পত্তির কিছু অংশ জেনে শুনে অন্যায় ভাবে গ্রাস করার উদ্দেশ্যে তা বিচারকদের কাছে পেশ করো না (সূরা বাকারা ১৮৮) “
তোমরা সীমা লঙ্ঘন করো না নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘন কারীদের ভালবাসেন না (সূরা বাকারা১৯০) এই সীমা আইনের সীমা, ধর্মের সীমা, অধিকারের সীমা বা ধৈর্যের সীমাও হতে পারে। হতে পারে তা জমির আইল অথবা রাস্তার দুই পাশের সীমানা, নদীর তীর অথবা বাড়ী-ঘর নির্মাণের আইনানুগ সীমানা। ব্যক্তিগত ও সামাজিক আচরণের সীমাও এর আওতায় আসতে পারে। এ জন্যেই প্রত্যাশার সীমা ছাড়িয়ে লোভে পড়ে হালাল রুজি ছেড়ে হারাম সম্পদ অর্জনও সীমালঙ্ঘন বটে।
মহান আল্লাহ বলেন “ আল্লাহ তোমাদের হালাল ও পবিত্র রিযিক যা দিয়াছেন তা হতে আহার কর” (সূরা নাহল-১৪)
হজরত সাঈদ ইবনে ইয়াজিদ (রাঃ) বলেন পাঁচটি গুনে ইলমেন পূর্ণতা রয়েছে। তাহলো আল্লাহকে চেনা, হক বুঝা, ইখলাছ পুর্ণ আমল, সুন্নাহ মোতাবেক চলা ও হালাল খাদ্য গ্রহণ করা।
এ পাঁচটির একটি হক নষ্ট করলে কোন আমল আল্লাহর কাছে গৃহীত হবে না। (কুরতুবি)
হজরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত রাসুল (সাঃ) বলেন কিয়ামতের দিন পাওনাদারদের পাওনা তোমাদেরকে অবশ্যই পরিশোধ করতে হবে। এমন কি শিংবিশিষ্ট ছাগল থেকে শিংবিহীন ছাগলের বদলা নেয়া হবে। (মুসলিম)
মানুষ যখন দূর্ণীতসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর অপকর্ম গুলো করে তখন তার উপর বিভিন্ন পরিস্থিতি প্রভার বিস্তার করে। যেমন- মাত্রাতিরিক্তি লোভ-লালসা। দয়াময় প্রতিপালক মানবজাতীকে কিছু পরীক্ষা মূলক বস্তুর লোভ লালসা অন্তঃ করনে প্রক্ষিপ্ত করেই তাদেরকে তিনি সৃষ্টি করেছেন।

আল্লাহ বলেন “মানবমন্ডলীকে রমনীগণের, সন্তান-সন্ততির, পুঞ্জীকৃত স্বর্ণ ও রোপ্য ভান্ডারের সুশিক্ষিত অশ্বের ও পালিত পশুর এবং শস্য ক্ষেতের প্রেমাকর্ষনী দ্বারা সুশোভিত করা হয়েছে। (ইমরান -১৪)
একারণে আমরা যদি কাউকে প্রশ্ন করি এতকিছু করছি কার জন্যে? জবাব দেই নিজের জন্যে তো কিছুই করছি না। যা কিছু করছি তা ঐ স্ত্রী, সন্তান দের জন্যেই করছি।
আমরা অত্যাধিক লোভে পতিত হয়ে বিভিন্ন প্রভাব খাটিয়ে দূর্নীতি করছি এতে যেমন একদিকে অন্যের অধিকার হরণ করে ধন-সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলছি, অপরদিকে আল্লাহর নিকট সীমালঙ্ঘনকারী হিসেবে অপরাধীর তালিকা ভূক্ত হচ্ছি।
দূর্নীতি হচ্ছে অন্যের ন্যায্য অধিকার বঞ্চিত করে অবৈধ্যভাবে সেই অধিকার নিজে ভোগ করা। একারনেই সমাজে নানা ধরনের অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। আর আমরা যরা দূর্নীতি করে অন্যের ন্যায্য অধিকারকে যে কোন অবৈধ পন্থায় ভোগ করছি এবং সেগুলোকে আবার পরবর্তী বংশ ধরদের জন্য জমা করে রাখছি। আমরা কি একবারও চিন্তা করে দেখেছি বা খুঁজেছি যে, এ ব্যাপারে আলকুরআন কি বলেছে? বৈধ-অবৈধ বাচ-বিচার না করে ধন-সম্পদের পিছনে মরিয়া হয়ে ছুটছি তাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেন “প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে মোহাচ্ছন্ন করে রাখে। যতক্ষন না তোমরা সামাধিসমূহে উপস্থিত হও। এটা সংগত নয় তোমরা শীঘ্রই জানতে পারবে, আবার বলি এটা সংগত নয় তোমরা শীঘ্রই এটা জানতে পারবে। সাবধান! তোমাদের আখেরাতের বিচারের দিনে আল্লাহর নিকট জবাবদিহিতার নিশ্চিত জ্ঞান থাকলে অবশ্যই তোমরা (বৈধ-অবৈধ, বাচ-বিচার না করে অত্যাধিক ধন-সম্পদ সংগ্রহে ) মোহাচ্ছন্ন হতে না (তাকাসুর)
হালাল জীবিকা মুমিন জীবনে একটি গুরুত্বপুর্ন অনুসঙ্গ। শারীরিক ও আর্থিক সব ধরণের ইবাদত কবুল হওয়ার জন্য পূর্বশর্ত হলো হালাল জীবিকা। হালালকে গ্রহণ ও হারামকে বর্জনের মধ্যেই রয়েছে মুমিনের দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা।
কাজেই সৎ উপাজর্নে আল্লাহর অনুগ্রহ থাকে আর অসৎ পথে উপর্জন দুনিয়া ও আখিরাতে লাঞ্চনা, অপমান ও দুঃখ বয়ে নিয়ে আসে। মহান আল্লাহর ওয়াদা ফেলে কোন মুমিন শয়তানের মিথ্যে ওয়াদার পথে পা বাড়াতে পারে না।
কাজেই আসুন আমরা নিজে এবং নিজের পরিবার দূর্নীতি মুক্ত রাখি আল্লাহতায়ালা আমাদের তাওফিক দান করুক। আমিন।

আরবী প্রভাষক
বাছড়া আজিজিয়া আলিম মাদরাসা
নাজিমখা, রাজারহাট, কুড়িগ্রাম।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here