ইসলাম ও স্বাধীনতা

0
177

মাও: মো: হাফিজুর রহমান
স্বাধীনতা মহান আল্লাহ তাআলার অপূর্ব দান। স্বাধীনতা যে কত বড় একটি নিয়ামত পরাধীনতার শৃংখলে আবদ্ধরাই কেবল তা অনুধাবন করতে পারে। স্বাধীনভাবে যা নয় তা করার নাম স্বাধীনতা নয়। প্রকৃত অর্থে স্বাধীনতা মানে একটি শর্ত, যেখানে একটি জাতি, দেশ বা রাষ্ট্র বা জায়গা তথায় থাকবে জনগণ, থাকবে নিজস্ব শাসন ব্যবস্থা এবং সাধারণত কোনো অঞ্চলের সার্বভৌমত্ব থাকবে। প্রকিৃতিগতভাবে মানুষ স্বাধীন। প্রত্যেক মানুষ মাতৃ গর্ভ থেকে স্বাধীনভাবে জন্ম গ্রহণ করে। আল্লাহ্ তায়ালা মানব জাতিকে সহজাত এমন প্রকৃতি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন যে, সে নিরঙ্কুশ কোনো সত্তা ছাড়া অন্য কারো কাছে নতি স্বীকার করতে চায় না। মহান আল্লাহ্ তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে সৃষ্টির সেরা জীব রূপে শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা দিয়ে মানব জাতিকে অত্যন্ত সম্মানিত করেছেন। তাই মানুষ স্বাভাবিকভাবে এবং সঙ্গত কারণে স্বাধীন চেতা। সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিকসহ কোনো পরাধীনতাই ইসলাম সমর্থন করে না।
স্বাধীনতা হচ্ছে প্রতিটি মানুষের, সমাজের প্রতিটি সদস্যের কাঙ্খিত ও অভিষ্ট লক্ষ্য। রাষ্ট্র অথবা সরকার স্বাধীনতার প্রতি যতটা গুরুত্ব দিবে,স্বাধীনতা সংরক্ষণের প্রতি যতটা তাগিদ করবে, জনমানসে তার স্থান ঠিক ততটাই সম্মানের স্থানে ভূষিত হবে। ইসলাম ব্যক্তি মানুষের স্বাধীনতা, তাকে অন্যদের কোপানল হতে রক্ষার বৃহৎ এজেন্ডা নিয়ে আগমন করেছে- হোক তা ধর্মীয়, চিন্তার কিংবা পলিটিক্যাল স্বাধীনতা অথবা কর্তব্য কর্ম ও ব্যয়ের স্বাধীনতা। ধর্মীয় স্বাধীনতার ব্যাপারে মহান আল্লাহ্র ঘোষণা- ‘ দ্বীন সম্পর্কে কোনো জোর-জবর দস্তি নেই, সত্য ভ্রান্তি হতে সুস্পষ্ট হয়েছে। (সুরা বাকারা-২৫৬)। অপর এক আয়াতে আল্লাহ্ তায়ালা বলেন,‘ আপনি আপনার প্রতিপালকের দিকে আহবান করুন হেকমত ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে এবং তাদের বিতর্ক করুন উত্তম উপায়ে।’ ( সুরা নাহল- ১২৫)। ইসলাম ধর্মীয় স্বাধীনতার পাশাপাশি মুসলিম ও অমুসলিমের আচরণ নীতিমালাও বর্ণনা করে দিয়েছে এবং ঘোষণা করেছে- অপরাপর ধর্মের অনুসারীদের ধর্ম চর্চা তাদের মৌলিক অধিকার। সূতরাং তাদের ধর্মোপাসনালয় ধ্বংস করা যাবে না, ধর্ম চর্চার ক্ষেত্রে আরোপ করা যাবে না ন্যূনতম বিঘœতা। বিবাহ, বিবাহ- বিচ্ছেদ এবং ভরণ-পোষণের ক্ষেত্রে দেয়া হয়েছে পূর্ণ স্বাধীনতা, যা তাদের ধর্মানুসারে বিধি সম্মত, তারা তা-ই পালন করবে। বুদ্ধিভিক্তিক ও যৌক্তিক নীতিমালা অনুসারে তাদের সম্মান ও স্বার্থ রক্ষাই হলো ইসলামের নীতি। আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন,‘ তারা যদি তোমার নিকট আগমন করে, তবে তুমি তাদের মাঝে বিচার ফায়সালা করো কিংবা তাদের হতে মুখ ফিরিয়ে নাও।’ ( সুরা মায়েদাহ- ৪২)। অর্থাৎ বিষয়টি তাদের বিধানের উপর ছেড়ে দিন। নবী (সা:) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো জিম্মিকে কষ্ট দিবে আমি তার বিরুদ্ধে দাঁড়াবো।’ আবু দাউদ ও বায়হাকীর বর্ণনায় এসেছে-‘যে ব্যক্তি কোনো চুক্তিবদ্ধকে নিপীড়ন করবে, তার ক্ষতি সাধন করবে কিংবা সাধ্যের অতিরিক্ত কোনো দায়িত্ব তার ঘাড়ে চাপিয়ে দিবে অথবা তার থেকে অনিচ্ছায় কোনো কিছু কেড়ে নিবে, কিয়ামত দিবসে আমি তার বিরুদ্ধে দাঁড়াবো।’ ( আবু দাউদ,হাদীস নং-২৬৫৪)।
ইসলাম যখন স্বাধীনতাকে তার মূলনীতি হিসেবে ঘোষণা করে তখন সময়টি ছিলো এমন যে, অধিকাংশ মানুষ বুদ্ধিবৃত্তিক, রাজনীতিক, সামাজিক, ধর্মীয় এবং অর্থনৈতিকভাবে আক্ষরিক অর্থেই ক্রীতদাসে পরিণত হয়েছিল। মানুষের এই বহুরূপ দাসত্ব শৃঙ্খলের বিরুদ্ধে ইসলাম স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে বিশ্বাসের, চিন্তার, কথা বলার এবং সমালোচনার স্বাধীনতাসহ সব ক্ষেত্রেই। মানুষের এ স্বাধীনতা খর্ব করার অধিকার কারো নেই। এ অধিকার খর্ব করা যেমন মানবাধিকার পরিপন্থি, তেমনি মহান আল্লাহ তায়ালার আইনের বিরোধীও বটে। তবে এ স্বাধীনতার অর্থ এও নয় যে, মানুষ স্বেচ্ছাচারিতা হয়ে জীবন পরিচালনা করবে।
মানব সমাজে স্বাধীন জাতি সত্ত্বা হিসেবে বেঁচে থাকার ধারা আদিকাল থেকেই চলে আসছে। ইসলাম আগমনের পূর্বে ‘জোর যার মুলুক তার’ নীতি চালু থাকলেও ইসলাম ধর্ম সমাজে একটি নিয়মতান্ত্রিক ব্যাবস্থাপনা ও সুশৃঙ্খলতা আনয়ন করে। ইসলাম বিচ্ছিন্নভাবে ও অর্থনৈতিক উপায়ে আধিপত্য বিস্তারের নীতিকে সমর্থন করে না। আবার কারো স্বাধীনতার অধিকার খর্ব করাকে জায়েজ মনে করে না। আমরা জানি, পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম ইসলামের নামে হলেও পরে তারাই রাষ্ট্র যন্ত্র ব্যাবহার কওে পূর্ব বাংলার মানুষের অধিকার হরণ করে ইসলামের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। মানুষের অধিকার হরণ করতেই শুরু করে আমাদের উপর অমানবিক বিভিন্ন নির্যাতন। তারা মানুষের অধিকার নিয়ে টালবাহানা শুরু করে, অধিকারের প্রশ্ন তুললে ২৫ মার্চ রাতের আধারে ঘুমন্ত মানুষের উপর হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে। তখন বাঁচার তাগিদেই মুক্তিকামী জনতা হাতে অস্ত্র তুলে নেয়। আমরা পাই একটি স্বাধীন দেশ, নিজস্ব পতাকা ও পৃথক মানচিত্র।
বস্তুত দেশ প্রেম ও জাতি প্রেমের কোনো বিকল্প নেই। দেশের প্রচলিত আইন-কানুন মেনে চলা, দেশীয় পণ্যকে প্রাধান্য দেয়া, জাতীয় সম্পদের সুরক্ষা, অপচয় রোধ, দুর্নীতি ও স্বজন প্রীতি মুক্ত প্রশাসন গড়ে তোলা, আইনপর শাসন প্রতিষ্ঠা ও স্বাধীনতা সার্বোভৌমত্ব রক্ষা ইত্যাদি বিষয়সমূহ হলো দেশপ্রেমের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাই বলতে পারি দুর্নীতি, স্বজন প্রীতি, দলীয়করণ, আত্মীয়করণ, লুটপাট, ক্ষমতার অপব্যবহার, আইনের অপপ্রয়োগ, জবর দখল, সুদ-ঘুষ, ঋণ খেলাপি ইত্যাদি বিষয়সমূহ অন্যের অধিকার খর্ব করে। এসকল কাজ স্বাধীনতার পরিপন্থী যা ইসলাম কখনো অনুমোদন করে না। আসুন সকলে মিলে স্বাধীনতা পরিপন্থী সকল কার্যকলাপ বন্ধ করি। দেশকে ভালবাসি। এবারের স্বাধীনতা দিবসে এটাই হোক আমাদের দীপ্ত শপথ।
লেখক: সহকারী সুপার, রাজিবপুর সবুজবাগ দাখিল মাদরাসা, রাজিবপুর, কুড়িগ্রাম।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here